পেকুয়া  প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের টেকপাড়া ও রূপালী বাজার এলাকার বেড়িবাঁধ দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও ভাঙন ও ধসে বাঁধ এতটাই সরু হয়ে পড়েছে যে, স্থানীয়দের ভাষায় তা এখন অনেকটা মাটির আইলের মতো। বর্ষা, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পানির চাপ বাড়লে এসব দুর্বল অংশ দিয়ে পানি লোকালয়ে ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।

এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোতে জরুরি সংস্কারকাজ শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে উজানটিয়ার কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কারে ১ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টি কমে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

কিছুদিন আগে পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় পেকুয়ার বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়। উজানটিয়ার টেকপাড়া, রূপালী বাজার ও আতর আলী এলাকার বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ দিয়ে পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ জনপদ তলিয়ে যায়। এতে কোটি কোটি টাকার মৎস্য প্রকল্প ও মজুত করা লবণ পানিতে ডুবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উজানটিয়া খান বাহাদুর স্কুলের পশ্চিম পাশে প্রায় ১০ চেইন, টেকপাড়া মসজিদ থেকে কাইছারের দোকান পর্যন্ত প্রায় ১২ চেইন এবং রূপালী বাজার এলাকায় প্রায় ৮ চেইন বেড়িবাঁধ দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও বন্যার সময় এসব অংশে পানির চাপ বেড়ে গেলে পানি বেড়িবাঁধ উপচে আশপাশের নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করে। এতে বিভিন্ন সময়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

এ ছাড়া উজানটিয়া ইউনিয়নের সোনালী বাজার থেকে আতর আলী পাড়া হয়ে গুদার পাড় পর্যন্ত ওয়াপদার বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশেও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখা গেছে। স্থানীয়রা ওই অংশের বাঁধ দ্রুত সংস্কার ও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে আগামী বর্ষা বা অতিবৃষ্টিতে ওই এলাকার মানুষও বড় ধরনের দুর্ভোগে পড়তে পারেন।

পাউবোর ৬৪/২বি পোল্ডারের আওতাধীন রূপালী বাজার বেড়িবাঁধের ভাঙন রোধ এবং টেকপাড়া এলাকার বেড়িবাঁধের ধস ঠেকাতে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের দাবি ছিল। বাঁধের বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উজানটিয়ার টেকপাড়া ও রূপালী বাজার হয়ে যাওয়া বেড়িবাঁধের অনেক অংশ এখন আর আগের মতো মজবুত নেই। কোথাও কোথাও ভাঙন ও ধসের কারণে বাঁধ এতটাই সরু ও দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, তা কার্যত মাটির আইলের মতো অবস্থায় রয়েছে। ভারী বৃষ্টি বা পানির তীব্র চাপে এসব অংশ ভেঙে গেলে আশপাশের বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও বিভিন্ন স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

স্থানীয় যুবক নবাব শরীফ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি করে আসছিলাম। কিন্তু এতদিন প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি। এখন জরুরি বরাদ্দ দেওয়া হওয়ায় উজানটিয়াবাসীর পক্ষ থেকে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”

উজানটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের পিপি মীর মোশাররফ হোসেন টিটু বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে উজানটিয়া ইউনিয়নের টেকপাড়া ও রূপালী বাজার এলাকার বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিতে ছিল। বন্যা ও অতিবৃষ্টির সময় হাজার হাজার পরিবার চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটায়।”

তিনি বলেন, “এখন অনেক জায়গায় বেড়িবাঁধ বলতে তেমন কিছু নেই, শুধু মাটির আইলের মতো অংশ রয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নির্দেশে পাউবো জরুরি ভিত্তিতে ১ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। এতে এলাকার মানুষ অনেক খুশি। পাউবোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃষ্টি বন্ধ হলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বেড়িবাঁধ শুধু বসতবাড়ি রক্ষার জন্য নয়; এলাকার কৃষিজমি, চিংড়িঘের, লবণমাঠ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও এটি সরাসরি জড়িত। তাই জরুরি মেরামতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এলাকায় স্থায়ীভাবে ব্লক বসানো এবং টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। প্রকল্পটির বরাদ্দসংক্রান্ত ফাইল বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে উপকূলীয় এসব এলাকার দীর্ঘদিনের ভাঙন, প্লাবন ও জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশে কমবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

এখন উজানটিয়ার খান বাহাদুর স্কুল সংলগ্ন এলাকা, টেকপাড়া মসজিদ থেকে কাইছারের দোকান পর্যন্ত অংশ এবং রূপালী বাজার এলাকার জরুরি বরাদ্দের আওতায় আসা ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কাজ দ্রুত শুরুর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। একই সঙ্গে সোনালী বাজার থেকে আতর আলী পাড়া হয়ে গুদার পাড় পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ওয়াপদার বেড়িবাঁধও সংস্কারের আওতায় আনার দাবি তাদের।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে পরিকল্পিত ও টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে উজানটিয়াসহ পেকুয়ার উপকূলীয় জনপদের মানুষের জানমাল, বসতবাড়ি ও জীবন-জীবিকা নিরাপদ করা হবে।